✨ WBBSE Class 5
📖 পাতাবাহার বাংলা
📌 ২২শ পাঠ সম্পূর্ণ নোটস
তালনবমী — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় : সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও ব্যাকরণ সমাধান
বিষয়
বাংলা সাহিত্য
অধ্যায়
তালনবমী (গল্প)
লেখক
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পাঠ্যপুস্তক
পাতাবাহার
📖 গল্পের পরিচিতি ও সারমর্ম
মূলভাব: কালজয়ী কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তালনবমী’ গল্পে গ্রামবাংলার এক হতদরিদ্র পরিবারের দুই শিশু নেপাল ও গোপালের নিদারুণ অনাহার ও এক করুণ স্বপ্নভঙ্গের বাস্তব চিত্র বর্ণিত হয়েছে। ভাদ্রের টানা বর্ষায় দরিদ্র ক্ষুদিরাম ভাজের পরিবারে দুদিন হাঁড়ি চড়েনি। গ্রামের অবস্থাপন্ন জটি পিসিমার বাড়িতে তালনবমীর ব্রত উপলক্ষে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন হচ্ছে জেনে ছোটো ভাই গোপাল নেমন্তন্ন পাওয়ার প্রবল আশায় ভোরবেলায় তালদিঘি থেকে তাল কুড়িয়ে বিনামূল্যে জটি পিসিমাকে দিয়ে আসে।
রাতে খিদের পেটে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে জটি পিসিমাদের বাড়ি পেটপুরে তালের পিঠে-পায়স খাওয়ার রঙিন স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পরদিন সকালে পাড়ার সব ধনী গৃহস্থের ছেলেরা নেমন্তন্ন খেতে গেলেও হতদরিদ্র গোপালদের কেউ ডেকেও দেখে না। সমাজের এই নির্দয় শ্রেণিভেদ এক নিষ্পাপ শিশুর মনকে কীভাবে ক্ষতবিক্ষত করে, তারই হৃদয়স্পর্শী দলিল এই গল্প।
১. জেনে নিয়ে নিজের ভাষায় উত্তর দাও
১.১ কোন মাসে তাল পাকে?
উত্তর: বাংলা বর্ষপঞ্জির ভাদ্র মাসে সাধারণত তাল পাকে।
১.২ আউশ ধান কোন ঋতুতে ঘরে ওঠে?
উত্তর: আউশ ধান সাধারণত বর্ষার শেষে বা শরৎ ঋতুতে (ভাদ্র মাসের শেষভাগে) কৃষকদের ঘরে ওঠে।
১.৩ গ্রাম জীবনে পালিত হয় এমন দুটি ব্রত বা পরবের নাম লেখো।
উত্তর: গ্রামবাংলায় পালিত দুটি সুপরিচিত ব্রত ও পরব হলো— ইতু পুজো এবং অগ্রহায়ণের নবান্ন উৎসব (এছাড়াও তালনবমী, পৌষপার্বণ)।
১.৪ বর্ষাকালে অন্ধকারে চলাফেরা করা ভালো নয় কেন?
উত্তর: বর্ষাকালে বৃষ্টির জলে মেঠোপথ ভিজে অত্যন্ত পিচ্ছিল ও কর্দমাক্ত হয়ে থাকে। এছাড়া ঝোপঝাড় ও জলের গর্তে সাপ, বিষাক্ত পোকামাকড় ও ব্যাঙের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় অন্ধকারে চলাফেরা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
১.৫ তাল থেকে তৈরি কোন কোন খাবার তোমার প্রিয়?
উত্তর: তাল থেকে প্রস্তুত সুস্বাদু তালের বড়া, তালের ক্ষীর, তিলপিটুলি এবং তালের নরম পিঠে আমার অতি প্রিয়।
২. এলোমেলো বর্ণ সাজিয়ে অর্থপূর্ণ শব্দ তৈরি করো
| এলোমেলো বর্ণ |
গঠিত সার্থক শব্দ |
এলোমেলো বর্ণ |
গঠিত সার্থক শব্দ |
| হুদূরবর্তীর |
বহুদূরবর্তী |
লঙ্গবারম |
মঙ্গলবার |
| লপিতিলিটু |
তিলপিটুলি |
অমস্কনন্য |
অন্যমনস্ক |
| রপাত্তউড়া |
উত্তরপাড়া |
কুঠাখোরকা |
খোকাঠাকুর |
৩. অর্থ না বদলে শব্দঝুড়ির সাহায্যে বাক্য পুনর্লিখন
৩ শব্দঝুড়ি: বৃষ্টির/বর্ষার, খিদে পেয়েছে, সাহস হয় না, রাত কাটবে, হেলে পড়ছে
৩.১ ক্ষুদিরাম ভাযের বাড়ি দুদিন হাঁড়ি চড়েনি। ➔ ক্ষুদিরাম ভাযের বাড়ি দুদিন রান্না হয়নি।
৩.২ কতক্ষণে যে রাত পোহাবে। ➔ কতক্ষণে যে রাত কাটবে।
৩.৩ কিন্তু সাহসে কুলোয় না তার। ➔ কিন্তু সাহস হয় না তার।
৩.৪ আমারও পেট চুঁই চুঁই করচে। ➔ আমারও খিদে পেয়েছে।
৩.৫ বাঁশঝাড় নুয়ে পড়চে বাদলার হাওয়ায়। ➔ বাঁশঝাড় হেলে পড়ছে বৃষ্টির/বর্ষার হাওয়ায়।
৪. গল্পের ঘটনাক্রম অনুযায়ী সাজিয়ে লেখো
৪ গল্পের বিষয়বস্তু অনুসারে সঠিক পর্যায়ক্রম:
১. ক্ষুদিরাম ভাজের বাড়ি দুদিন হাঁড়ি চড়েনি। (৪.২)
২. গোপাল একছুটে চলে গেল গ্রামের পাশে সেই তালদিঘির ধারে। (৪.৩)
৩. ‘ওরা নেমন্তন্ন করবে, দেখিস দাদা, কাল তো তালনবমী।’ (৪.৫)
৪. ঘুমের মধ্যে ওসব কী হিজিবিজি স্বপ্ন সে দেখছিল। (৪.১)
৫. গোপাল বললে, ‘কোথায় যাচ্ছিস তোরা?’ (৪.৪)
৫. বিশেষণ ও পাঠ্যাংশের প্রয়োগ
৫ ‘তাল’ ও ‘আকাশ’ সম্পর্কিত বিশেষণসমূহ:
৫.১ ‘তাল’ ফলের নানান বিশেষণ: কালো হেঁড়ে, ভালো, মিশকালো, বড়ো, কালো কুচকুচে এবং ছোটো।
৫.২ ‘মেঘাচ্ছন্ন আকাশ’-এর অনুরূপ বিশেষণ: গল্পে ব্যবহৃত সঠিক শব্দটি হলো মেঘ-জমকালো (আকাশ)।
৬. পদের শ্রেণিবিভাগ (শব্দঝুড়ি থেকে)
মঙ্গলবার
আকাশ
নেমন্তন্ন
চলাফেরা
৭. সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়াপদ নির্ণয়
৭ কাজ শেষ হওয়া ও কাজ শেষ না হওয়া ক্রিয়াপদ:
৭.১ কাজ শেষ হয়নি (অসমাপিকা): পেরে | কাজ শেষ হয়েছে (সমাপিকা): উঠেছে
৭.২ কাজ শেষ হয়নি: বলে, করে, নিয়ে | কাজ শেষ হয়েছে: গেলেন
৭.৩ কাজ শেষ হয়নি: রেগে, দাঁড়িয়ে, উঠে | কাজ শেষ হয়েছে: বললে, করবে
৭.৪ কাজ শেষ হয়নি: উঠে, ঘুমিয়ে | কাজ শেষ হয়েছে: দেখলে
৮ & ৯. শব্দার্থ, বাক্য গঠন ও বিপরীতার্থক শব্দ
| শব্দ |
অর্থ |
সার্থক বাক্য রচনা |
| সদর দোর |
প্রধান ফটক বা সিংহদ্বার |
পূজার সকালে বাড়ির সদর দোরে আমপাতা ও মঙ্গলঘট সাজানো হলো। |
| কপাট |
দরজা বা জানলার পাল্লা |
কালবৈশাখী ঝড়ের দমকা হাওয়ায় জানলার কপাট সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। |
| মূল শব্দ |
বিপরীত শব্দ |
মূল শব্দ |
বিপরীত শব্দ |
| সলজ্জ |
নির্লজ্জ |
সাধ্য |
অসাধ্য |
| সুখাদ্য |
কুখাদ্য |
আগ্রহ |
অনাগ্রহ / নিরাসক্তি |
| অন্ধকার |
আলো |
— |
— |
১০. বাক্য রচনা করো
১০ অর্থপূর্ণ বাক্যে প্রয়োগ:
গৃহস্থ: সামান্য আয়ের সরল গৃহস্থ মানুষটি পরিবার নিয়ে শান্তিতে বাস করতেন।
পিঠে: পৌষসংক্রান্তির উৎসবে মা আতপ চাল ও নতুন গুড় দিয়ে সুস্বাদু পিঠে বানান।
আশ্চর্য: জাদুকরের অদ্ভুত ম্যাজিক দেখে উপস্থিত সমস্ত দর্শকেরা আশ্চর্য হয়ে গেল।
জোনাকি: ঘন বর্ষার রাতের অন্ধকারে বাঁশবাগানের ঝোপে শত শত জোনাকি আলো জ্বালছিল।
তালনবমী: ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে তালনবমী ব্রত পালিত হয়।
১১. ধ্বন্যাত্মক শব্দ, পদবির ব্যুৎপত্তি ও কথ্য রূপান্তর
১১ ভাষা ও ব্যাকরণ বিশ্লেষণ:
ধ্বনিবাচক শব্দ: হু হু (হাওয়ার শব্দ), খট্ খট্ (কপাট নড়ার শব্দ), কটকটে (ব্যাঙের ডাক), চুঁই ছুঁই (খিদের অনুভূতির শব্দ)।
পদবির মূল রূপ: ‘বাঁড়ুজ্যে’ ➔ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘ভাজ’ ➔ ভট্টাচার্য। (অন্যান্য: চাটুজ্যে ➔ চট্টোপাধ্যায়, মুখুজ্যে ➔ মুখোপাধ্যায়, গাঙুলি ➔ গঙ্গোপাধ্যায়)।
কথ্য রূপের উৎস: ‘পড়েচে’ ➔ পড়েছে, ‘খেয়েচে’ ➔ খেয়েছে (আঞ্চলিক চলিত ক্রিয়ারূপ)।
১২. ঋতুভিত্তিক লক্ষণ ও গোপালের আচরণ বিচার
১২.১ গল্পে বর্ষা ঋতুর পরিচয়জ্ঞাপক কোন কোন সূত্র ছড়িয়ে রয়েছে?
উত্তর: ভাদ্র মাস, তালনবমীর ব্রত, আউশ ধান ওঠার সময়, মেঠোপথে একহাঁটু জল-কাদা, মেঘ-জমকালো অন্ধকার আকাশ, একটানা ঝমঝম ও টিপটিপ বৃষ্টি, বাঁশবাগানে বাদলার হাওয়া এবং ডোবায় কটকটে ব্যাঙের সমবেত ডাক—এই সমস্ত বর্ণনা গল্পটির বর্ষা ঋতুর অকাট্য প্রমাণ দেয়।
১২.২ গোপাল কি সত্যি বোকামি করেছিল? সে তোমার বন্ধু হলে তুমি তাকে কী করতে বলতে?
উত্তর: হ্যাঁ, বাস্তব সমাজের স্বার্থপরতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে গোপাল সরল মনে বোকামিই করেছিল। সে যদি আমার বন্ধু হতো, তবে আমি তাকে বিনামূল্যে কাউকে তাল না দিয়ে বাজারে চার পয়সায় বিক্রি করতে বলতাম। সেই উপার্জিত পয়সা দিয়ে পরিবারের জন্য মুড়ি বা খাবার কিনে এনে অনাহার দূর করার বাস্তব পরামর্শ দিতাম।
১২.৩ কী ধরনের বৃষ্টি তোমার পছন্দ এবং কেন?
উত্তর: আমার হালকা টিপটিপ বৃষ্টি পছন্দ। কারণ এই বৃষ্টিতে চারপাশের প্রকৃতি স্নিগ্ধ ও মনোরম হয়ে ওঠে এবং অবিশ্রান্ত ভারী বর্ষার মতো ঘরে বন্দি না থেকে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানো যায়।
১৩. লেখক পরিচিতি (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় : ১৮৯৪ – ১৯৫০)
১৩.১ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’-র রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের অমর স্রষ্টা হলেন কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৩.২ ছোটোদের জন্য লেখা তাঁর দুটি বিখ্যাত রোমাঞ্চকর বইয়ের নাম লেখো।
উত্তর: ছোটোদের জন্য লেখা তাঁর দুটি কালজয়ী অ্যাডভেঞ্চার গ্রন্থ হলো— ‘চাঁদের পাহাড়’ এবং ‘হীরা মানিক জ্বলে’।
১৩.৩ কত সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ প্রদান করা হয়?
উত্তর: ‘ইছামতী’ উপন্যাসের জন্য ১৯৫১ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।
১৪. বিশদ ও ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর
১৪.১ & ১৪.২ শিশু চরিত্রের পরিচয় ও বর্ষায় ক্ষুদিরাম ভাজের সাংসারিক অবস্থা
শিশু চরিত্র: বড়ো ভাই নেপাল (বাস্তববাদী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন) এবং ছোটো ভাই গোপাল (অত্যন্ত সরল, আবেগপ্রবণ ও স্বপ্নচারী)।
ক্ষুদিরামের অবস্থা: সামান্য আয়ের গ্রামীণ পুরোহিত ক্ষুদিরাম ভাজের পরিবারে চরম অনটন। যজমান বাড়ি থেকে পাওয়া ধান শেষ হয়ে যাওয়ায় দুদিন ধরে তাদের ঘরে হাঁড়ি চড়েনি এবং ছেলেমেয়েরা খিদের জ্বালায় ছটফট করছিল।
১৪.৩-১৪.৬ জটি পিসিমা ও তাল সংগ্রহের বৃত্তান্ত
চুনির মা কেন গিয়েছিল? ➔ তালনবমীর ভোজের ডাল ভাঙার কাজে সাহায্য করতে।
কখন তালের প্রয়োজন হয়েছিল? ➔ মঙ্গলবার তালনবমীর ব্রতে তালের পিঠে-বড়া বানাতে।
কে তাল জোগাড় করে দিল? ➔ গোপাল ভোরবেলায় একা গিয়ে তালদিঘির কাদা ও সাপের ভয় অগ্রাহ্য করে দুটি মিশকালো তাল কুড়িয়ে জটি পিসিমাকে বিনামূল্যে দিয়ে আসে।
জটি পিসিমার ভালো নাম: ➔ জটি পিসিমার প্রকৃত ভালো নাম হলো হরিমতী।
১৪.৭ বর্ষারাতে গোপালের দেখা স্বপ্ন কীভাবে মিথ্যা হয়ে গেল?
উত্তর: বর্ষার রাতে খিদের জ্বালায় ঘুমোতে গিয়ে গোপাল মনের আনন্দে স্বপ্ন দেখেছিল যে জটি পিসিমা তাকে আদর করে পিঁড়ি পেতে বসিয়ে তিলপিটুলি, তালের বড়া আর ক্ষীর-পায়েস পরিবেশন করছেন এবং সে তৃপ্তিভরে খাচ্ছে।
কিন্তু পরদিন সকালে স্নান সেরে নতুন জামা পরে সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেও জটি পিসিমাদের বাড়ি থেকে কোনো নেমন্তন্ন আসেনি। বিত্তবান পরিবারের অন্য ছেলেমেয়েরা সেজেগুজে নেমন্তন্ন খেতে গেলেও হতদরিদ্র হওয়ার অপরাধে গোপালদের উপেক্ষা করা হয়। এভাবেই স্বার্থপর সমাজের অবহেলায় এক অভুক্ত নিষ্পাপ শিশুর মিষ্টি স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।